ভাঙনের মুখে তৃণমূল, কিন্তু তহবিলে কোটি কোটি টাকা! কত সম্পত্তির মালিক মমতা-অভিষেকের দল?
কলকাতা: দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর রাজ্যে নজিরবিহীন রাজনৈতিক সংকটের মুখে তৃণমূল কংগ্রেস। বিধানসভার ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে প্রায় ৬০ জনই এখন বিক্ষুব্ধ শিবিরে। লোকসভাতেও দলের প্রায় ২০ জন সাংসদ একে একে হাত ছাড়ছেন জোড়াফুলের। একদিকে যখন বিক্ষুব্ধদের দলবদলের হিড়িক, অন্যদিকে তখন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে রাজ্যে একের পর এক মামলা দায়ের হচ্ছে। রাজনৈতিক মহলে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠে গেছে— দলের নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক কি আদৌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে থাকবে?

রাজনৈতিকভাবে দল যখন অস্তিত্বের সংকটে, তখন কিন্তু আর্থিক খতিয়ানের দিক থেকে তৃণমূল ভারতের অন্যতম ধনী আঞ্চলিক দল। নির্বাচন কমিশনের (Election Commission) ওয়েবসাইটে জমা দেওয়া ২০২৪-২০২৫ অর্থবর্ষের (৩১ মার্চ, ২০২৫ পর্যন্ত) অফিশিয়াল অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, তৃণমূলের ঝুলিতে রয়েছে বিপুল সম্পত্তি।

এক নজরে দেখে নেওয়া যাক তৃণমূল কংগ্রেসের সেই সম্পত্তির এক্স-রে রিপোর্ট:
তৃণমূলের অডিট রিপোর্ট: ব্যাঙ্ক ব্যালান্স ও ফিক্সড ডিপোজিট
তৃণমূল কংগ্রেসের জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, দলটির আসল অর্থনৈতিক শক্তি লুকিয়ে রয়েছে তাদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট এবং ফিক্সড ডিপোজিটে (FD)।
| সম্পত্তির ধরণ | টাকার পরিমাণ (অঙ্ক) | টাকার পরিমাণ (কথায়) |
| ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জচ্ছিত টাকা | ₹৬,২৫,৭৯,৮৭,২৬৪ | ৬২৫ কোটি ৭৯ লক্ষ ৮৭ হাজার ২৬৪ টাকা |
| ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট (FD) | ₹২,৫০,৭৭,২৮,৩২২ | ২৫০ কোটি ৭৭ লক্ষ ২৮ হাজার ৩২২ টাকা |
| মোট ব্যাঙ্ক ব্যালান্স | ₹৮,৭৬,৫৭,১৫,৫৮৬ | ৮৭৬ কোটি ৫৭ লক্ষ ১৫ হাজার ৫৮৬ টাকা |
নগদ টাকা এবং চেকের হিসাব
শুধু ব্যাঙ্কেই নয়, দলটির হাতে নগদ এবং চেক মারফতও বিপুল অর্থ রয়েছে:
- হাতে থাকা চেক: অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, চেক হিসেবে তৃণমূলের ঘরে আরও ৫০,০০,০০,০০০ টাকা (৫০ কোটি টাকা) জমা রয়েছে।
- নগদ বা ক্যাশ টাকা: দলটির কেন্দ্রীয় (দিল্লি) এবং আঞ্চলিক (কলকাতা ও অন্যান্য জেলা) কার্যালয় মিলিয়ে ক্যাশ বা নগদ হিসেবে রয়েছে ৩১,২৮,০২৮ টাকা (৩১ লক্ষ ২৮ হাজার ২৮ টাকা)।
দলীয় কার্যালয় ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি (অতিরিক্ত তথ্য)
নির্বাচন কমিশনের বিগত কয়েক বছরের ট্রেন্ড এবং অডিট খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে দলটির আরও কিছু সম্পত্তির উৎস সামনে আসে:
- তৃণমূল ভবন ও জমি: কলকাতার বাইপাসের ধারে তৃণমূলের মূল দলীয় কার্যালয় (তৃণমূল ভবন) ছাড়াও বিভিন্ন জেলা ও ব্লকে দলের নিজস্ব জমি ও পাকা কার্যালয় রয়েছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েকশো কোটি টাকা।
- আয়ের মূল উৎস (ইলেকটোরাল বন্ড ও অনুদান): সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক ইলেকট্রোরাল বন্ড (Electoral Bonds) নিষিদ্ধ হওয়ার আগে পর্যন্ত তৃণমূলের আয়ের সিংহভাগ আসত এই বন্ড থেকে। অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, বিজেপি এবং কংগ্রেসের পরেই বন্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি টাকা পেয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এছাড়াও দলটির দলীয় মুখপত্র ‘জাগো বাংলা’র বিক্রি, সদস্য পদের চাঁদা এবং অনুগামীদের স্বেচ্ছাসেবী অনুদানও আয়ের অন্যতম উৎস।
রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বনাম বিপুল সম্পত্তি: বড় প্রশ্ন
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কোনো দলের সিংহভাগ বিধায়ক ও সাংসদ (দুই-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি) দল ত্যাগ করে অন্য কোনো জোটে (যেমন এনডিএ) যোগ দেন বা নতুন দল গঠন করেন, তবে মূল দল ও তার প্রতীকের দাবিদার কারা হবেন, তা ঠিক করে নির্বাচন কমিশন।
যদি দল সত্যিই ভেঙে দু-টুকরো হয়ে যায়, তবে ব্যাঙ্কে থাকা এই ৮৭৬ কোটি টাকারও বেশি তহবিল এবং স্থাবর সম্পত্তি কোন শিবিরের নিয়ন্ত্রণে থাকবে— মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীদের হাতে, নাকি বিক্ষুব্ধ শিবিরের হাতে? এই প্রশ্নই এখন কলকাতার অলিতে-গলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে।












