খড়গপুরে ‘দাবাং’ দিলীপের পাশে শুভেন্দু! পুরনো দ্বন্দ্ব ভুলে নতুন সমীকরণ?

গোলবাজার এলাকা তখন কার্যত জনসমুদ্রে পরিণত। গেরুয়া পতাকা হাতে রাস্তাজুড়ে এগোচ্ছেন অসংখ্য কর্মী-সমর্থক, সঙ্গে চলেছে ট্যাবলো। সেই হুড খোলা ট্যাবলোতেই পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুই প্রভাবশালী নেতা আলাপচারিতা, হাসি-মজার ফাঁকে জনতার দিকে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন তাঁরা।

এমন দৃশ্যই ধরা পড়ল মেদিনীপুরে। শনিবার খড়গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাঁর সঙ্গেই দেখা গেল শুভেন্দু অধিকারীকে।
শনিবার দুপুর প্রায় ২টো নাগাদ জাঁকজমকপূর্ণ রোড শো করে নিজের মনোনয়ন জমা দেন খড়গপুর সদরের বিজেপি প্রার্থী দিলীপ ঘোষ। সারাদিনই তাঁর পাশে ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দিলীপের মনোনয়ন পর্বে উপস্থিত ছিলেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তাও। সকাল প্রায় দশটার সময় খড়গপুর রাম মন্দিরে পুজো দিয়ে মিছিলের সূচনা করেন দিলীপ ঘোষ। সেখান থেকে গোলবাজার পেরিয়ে মিছিল গিয়ে পৌঁছয় খড়গপুর মহকুমা শাসকের দফতরে, যেখানে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনয়ন জমা দেন তিনি।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে খড়গপুর সদর কেন্দ্র থেকেই প্রথমবার বিজেপির বিধায়ক হয়েছিলেন দিলীপ ঘোষ। তবে ২০১৯ সালে মেদিনীপুর থেকে লোকসভায় জয়ের পর উপনির্বাচনে এই আসনটি হাতছাড়া হয় বিজেপির। যদিও ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে আবার এই কেন্দ্র ফিরে পায় গেরুয়া শিবির। সেই সময় প্রার্থী ছিলেন অভিনেতা হিরণ চট্টোপাধ্যায়।
তাঁর হাত ধরেই জয় এলেও এবার তাঁকে প্রার্থী করেনি দল। বরং পুরনো ঘাঁটি পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব আবারও তুলে দেওয়া হয়েছে দিলীপ ঘোষের কাঁধে। ফলে নিজের শক্ত ঘাঁটিতে এবার তাঁর কাছে লড়াইটা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর থেকেই তিনি জোরদার প্রচারে নেমে পড়েছেন। খড়গপুর সদরে ‘এক লক্ষ মার্জিনে’ জয়ের আত্মবিশ্বাস আগেই প্রকাশ করেছেন দিলীপ। তবে চূড়ান্ত ফলাফল কোন দিকে যাবে, তা জানা যাবে ৪ মে। শনিবার তাঁর প্রচারকে ঘিরে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ছিল চোখে পড়ার মতো।
অন্যদিকে, দিলীপ ঘোষের মনোনয়নে শুভেন্দু অধিকারীর উপস্থিতি রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। কারণ গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই বিজেপির অভিজ্ঞ নেতা দিলীপ ঘোষ এবং সদ্য দলে যোগ দেওয়া শুভেন্দু অধিকারীর সম্পর্ক নিয়ে নানা জল্পনা ছিল।
সেই সময় মেদিনীপুর থেকে বর্ধমান দুর্গাপুর কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছিল দিলীপকে, যেখানে তৃণমূলের কীর্তি আজাদের কাছে তিনি বড় ব্যবধানে পরাজিত হন। এরপরই দলের অন্দরে অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসে। দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, “আমাকে হারানোর জন্য দলেই কাঠিবাজি হয়েছে।” সরাসরি কারও নাম না নিলেও, তাঁর মন্তব্যের নিশানা যে শুভেন্দুর দিকেই ছিল, এমনটাই মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
যদিও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁদের একসঙ্গে দেখা গিয়েছে, তবুও পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা তেমন চোখে পড়েনি আগে। কিন্তু পাঁচ বছর পর বর্তমান নির্বাচনী পরিস্থিতিতে সেই সমীকরণে যেন বদল এসেছে। দিলীপ ও শুভেন্দুর সম্পর্কের এই নতুন রূপ রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
একে অপরের মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় উপস্থিতি সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। শনিবার দিলীপ ঘোষের মনোনয়নে শুভেন্দু অধিকারীকে তাঁর পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উপরমহলের নির্দেশেই কি এই সৌজন্যের প্রদর্শন? রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, অতীতের দূরত্ব ভুলে এই ‘ভাব’ প্রদর্শনের মাধ্যমে তৃণমূল স্তরে ঐক্যের বার্তা পৌঁছে দেওয়াই হতে পারে মূল লক্ষ্য।












