গণনার দিনেই স্পষ্ট হবে ক্ষমতার সমীকরণ

ভোট শেষ, শুরু অপেক্ষা, গণনার দিনেই স্পষ্ট হবে ক্ষমতার সমীকরণ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর রাজ্যের প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক নজর এখন কেন্দ্রীভূত হয়েছে গণনার দিনের দিকে, যখন ইভিএমে সংরক্ষিত ভোটারের রায় প্রকাশ্যে আসবে এবং স্পষ্ট হবে আগামী দিনে রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভার কার হাতে যেতে চলেছে। দুই দফায় অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ২৩ এপ্রিল প্রথম দফা এবং ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, এবং সেই ভোট এখন সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে বিভিন্ন স্ট্রংরুমে, যেখান থেকে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে গণনার দিন সেগুলি নিয়ে যাওয়া হবে গণনাকক্ষে।

নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আগামী ৪ মে সকাল ৮টা থেকে শুরু হবে ভোটগণনা, যা একটি বহুস্তরীয় এবং সুসংহত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। সাধারণত গণনা শুরু হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাথমিক ফলাফলের প্রবণতা স্পষ্ট হতে শুরু করে। অভিজ্ঞতা বলছে, দুপুর ১২টার মধ্যেই কয়েক দফার গণনা সম্পন্ন হয়ে যায় এবং তাতেই বোঝা যায় কোন প্রার্থী এগিয়ে রয়েছেন এবং কোথায় লড়াই ঘনিয়ে উঠছে। যদিও সব ক্ষেত্রে এই প্রবণতা একরকম থাকে না, কারণ বহু কেন্দ্রেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা এতটাই কাছাকাছি হয় যে শেষ রাউন্ড পর্যন্ত ফল অনিশ্চিত থাকে।

গণনার পদ্ধতি অনুসারে প্রথমেই গোনা হয় পোস্টাল ব্যালট, যা মূলত সরকারি কর্মচারী, নিরাপত্তারক্ষী এবং নির্দিষ্ট কিছু ভোটারের জন্য প্রযোজ্য। এর পরেই শুরু হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএমে সংরক্ষিত ভোটের গণনা। প্রতিটি ইভিএমের দুটি প্রধান অংশ থাকে, ব্যালট ইউনিট এবং কন্ট্রোল ইউনিট, যার মাধ্যমে ভোটার তাঁর পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন এবং সেই ভোট সুরক্ষিতভাবে সংরক্ষিত থাকে। পাশাপাশি প্রতিটি বুথে ব্যবহৃত হয় ভিভিপ্যাট মেশিন, যার মাধ্যমে ভোটার নিশ্চিত হতে পারেন যে তিনি যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, সেই ভোট সঠিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ইভিএমগুলি বুথেই উপস্থিত রাজনৈতিক দলের এজেন্টদের সামনে সিল করে দেওয়া হয় এবং তারপর কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সেগুলি স্ট্রংরুমে নিয়ে যাওয়া হয়। এই স্ট্রংরুমগুলি নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং সেখানে ২৪ ঘণ্টা কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকে। প্রতিটি স্ট্রংরুমে ডবল লক সিস্টেম চালু থাকে এবং কে কখন সেখানে প্রবেশ করছেন বা বের হচ্ছেন, তার বিস্তারিত নথি সংরক্ষণ করা হয়। পাশাপাশি সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হয়, যাতে কোনও ধরনের অনিয়মের সম্ভাবনা ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা যায়।

নিরাপত্তার বিষয়টি আরও জোরদার করতে নির্বাচন কমিশন প্রতিটি স্ট্রংরুমে ন্যূনতম ২৪ জন কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করেছে এবং প্রয়োজনে সেই সংখ্যা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। স্ট্রংরুমের বাইরের এলাকায় রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকতে পারেন, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ থাকে এবং কোনও পক্ষের মধ্যে সন্দেহের অবকাশ না থাকে।

গণনার দিন স্ট্রংরুম থেকে ইভিএমগুলি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে গণনাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়াটিও অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং প্রতিটি ধাপে সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। গণনাকক্ষে প্রবেশের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং শুধুমাত্র অনুমোদিত ব্যক্তিরাই সেখানে প্রবেশ করতে পারেন। রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার, কাউন্টিং স্টাফ, পর্যবেক্ষক, প্রার্থী এবং তাঁদের এজেন্ট ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ।

গণনাকেন্দ্রে ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর থাকে। কেন্দ্রের বাইরে ১০০ মিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে কোনও যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না এবং সেই এলাকায় রাজ্যের সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন থাকে। গণনাকক্ষের ভিতরে কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং পুলিশ যৌথভাবে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে। প্রতিটি প্রবেশপথে কঠোর তল্লাশি চালানো হয় এবং অনুমোদিত পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে ভিতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই পরিচয়পত্রগুলিতে কিউআর কোড সংযুক্ত থাকে, যা স্ক্যান করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় যাচাই করা হয়।

গণনার সময় মোবাইল ফোন, ক্যামেরা বা অন্য কোনও ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহারের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা থাকে, যাতে ভোটের গোপনীয়তা বজায় থাকে এবং কোনও তথ্য বাইরে ফাঁস না হয়। পুরো গণনা প্রক্রিয়াটি বাধ্যতামূলকভাবে ভিডিওগ্রাফি করা হয়, যার মধ্যে স্ট্রংরুম খোলা, ইভিএম আনা, গণনা এবং ফল ঘোষণা— সবকিছু অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই ভিডিওগুলি সংরক্ষণ করে রাখা হয় ভবিষ্যতে প্রয়োজনে যাচাই করার জন্য।

গণনার সময় প্রতিটি ইভিএমের কন্ট্রোল ইউনিটে থাকা ‘রেজাল্ট’ বোতাম টিপে ভোটের সংখ্যা জানা হয়। এরপর নির্দিষ্ট ফর্মে সেই তথ্য নথিভুক্ত করা হয়। প্রতিটি রাউন্ডের গণনা শেষে ফলাফল ঘোষণা করা হয় এবং প্রার্থী বা তাঁদের এজেন্টরা সেই তথ্য নথিভুক্ত করতে পারেন। একটি গণনাকক্ষে সাধারণত একাধিক টেবিল থাকে এবং প্রতিটি টেবিলে একসঙ্গে গণনা চলতে থাকে। প্রতিটি রাউন্ডে নির্দিষ্ট সংখ্যক টেবিলে গণনা সম্পন্ন হয় এবং সেই অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

গণনার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে ফর্ম ১৭সি এবং ফর্ম ২০ ব্যবহার করা হয়, যা পুরো প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই ফর্মগুলির মাধ্যমে মোট ভোটের সংখ্যা, প্রতিটি প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট এবং নোটা ভোটের হিসাব সংরক্ষণ করা হয়। যদি কোনও ক্ষেত্রে এই হিসাবের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা যায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হয় এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

গণনার শেষ পর্যায়ে নির্দিষ্ট বুথের ভিভিপ্যাট স্লিপ গোনা হয় এবং তা ইভিএমের ফলাফলের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়, যাতে ভোটের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা যায়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি বহুস্তরীয় নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হয়, যাতে নির্বাচন ফলাফল নিয়ে কোনও ধরনের প্রশ্ন না ওঠে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যেও চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে রয়েছে। বিভিন্ন বুথফেরত সমীক্ষায় ভিন্ন ভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যেখানে কিছু সমীক্ষায় বিজেপি এগিয়ে রয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের ভালো ফলের সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসনে জয় পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, যদিও অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এই ধরনের সমীক্ষা সবসময় বাস্তব ফলাফলের সঙ্গে মেলে না।

সব মিলিয়ে, ভোটারদের রায় এখন যন্ত্রবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং সেই রায় প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে গোটা রাজ্য। আগামী ৪ মে-র গণনা শুধু একটি নির্বাচনের ফল ঘোষণা করবে না, বরং নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গের আগামী দিনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা।

Attention Required! | Cloudflare

Sorry, you have been blocked

You are unable to access wajibjp.cfd

Why have I been blocked?

This website is using a security service to protect itself from online attacks. The action you just performed triggered the security solution. There are several actions that could trigger this block including submitting a certain word or phrase, a SQL command or malformed data.

What can I do to resolve this?

You can email the site owner to let them know you were blocked. Please include what you were doing when this page came up and the Cloudflare Ray ID found at the bottom of this page.