বর্ধমান রাজনীতি দেশ-বিদেশ দক্ষিণবঙ্গ ক্রাইম স্বাস্থ্য ধর্ম লাইফ-স্টাইল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি চাকরি কৃষি-কাজ রেসিপি ক্রিকেট ফুটবল
---Advertisement---

“ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসি: রোসারিওর অলিগলি থেকে বিশ্বজয়ের মুকুট ও অমর বিদায়”

Published on: October 7, 2026
---Advertisement---

Join WhatsApp

Join Now

ফুটের জাদুকর লিওনেল মেসি-র শৈশবের রোমাঞ্চকর পথ চলা থেকে শুরু করে বিশ্বজয়ের মুকুট পরে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানো পর্যন্ত পুরো গল্পটি এক জাদুকরী ও অনুপ্রেরণামূলক উপাখ্যান।

১. ছোট্ট রারিও থেকে জাদুর শুরু (শৈশব ও সংগ্রাম)

১৯৮৭ সালের ২৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম হয় লিওনেল আন্দ্রেস মেসির। অত্যন্ত সাধারণ এক পরিবারে বেড়ে ওঠা ছোট লালের রক্তে ছিল ফুটবল। মাত্র ৫ বছর বয়সে বাবা হোর্হে মেসির কোচিংয়ে ‘গ্রান্দোলি’ ক্লাবে ফুটবল পায়ে হাতেখড়ি হয় তার। এরপর স্থানীয় ক্লাব নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের হয়ে তার দুর্দান্ত ড্রিবলিং সকলের নজর কাড়ে।

কিন্তু এই পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় এক শারীরিক সমস্যা। ১১ বছর বয়সে তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি (Growth Hormone Deficiency) ধরা পড়ে। ব্যয়বহুল সেই চিকিৎসার খরচ জোগানো গরিব পরিবারের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। আর্জেন্টিনার কোনো ক্লাব যখন মেসির চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে রাজি হচ্ছিল না, তখন ত্রাতা হয়ে এগিয়ে আসে স্পেনের বিখ্যাত ক্লাব এফসি বার্সেলোনা। মাত্র ১৩ বছর বয়সে পরিবারের মায়া ত্যাগ করে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে স্পেনের লা মাসিয়া অ্যাকাডেমিতে পা রাখেন ছোট্ট মেসি।

২. বার্সেলোনা অধ্যায়: সোনালী যুগ ও বিশ্বজয়

২০০৪ সালের ১৬ অক্টোবর, মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার সিনিয়র দলের হয়ে প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে অভিষেক হয় মেসির। এরপর শুরু হয় এক অবিশ্বাস্য ইতিহাস। পেপ গার্দিওলার অধীনে জাভি, ইনিয়েস্তাদের সঙ্গে নিয়ে মেসি বিশ্ব ফুটবলে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন।

  • বার্সেলোনার জার্সিতে তিনি জিতেছেন রেকর্ড সংখ্যক ট্রফি— যার মধ্যে রয়েছে একাধিক লা লিগা ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ।
  • ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে একের পর এক রেকর্ড ভেঙে তিনি টানা চারবার সহ রেকর্ড সংখ্যক ব্যালন ডি’অর (Ballon d’Or) জয় করেন।
  • বার্সেলোনার জার্সিতে ৬৭২টি গোল করে তিনি ক্লাবের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও কিংবদন্তিতে পরিণত হন। ২০২১ সালে আর্থিক জটিলতার কারণে কান্নাজড়িত হৃদয়ে বার্সেলোনা ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এরপর পিএসজি (PSG) হয়ে পরবর্তীতে তিনি আমেরিকার ক্লাব ইন্টার মিয়ামিতে যোগ দেন।

৩. আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার: চোখের জল থেকে পরম প্রাপ্তি

ক্লাব ফুটবলের সব আকাশচুম্বী সাফল্য থাকলেও শুরুর দিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ভাগ্য যেন বিমুখ ছিল। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল এবং কোপা আমেরিকার ফাইনালে বারবার ফাইনালে হেরে গিয়ে চোখের জলে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল তাকে। সমালোচকদের তীব্র বাণে জর্জরিত হয়ে একসময় জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু হার না মানা জেদ নিয়ে তিনি ফিরে আসেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার হয়ে তাঁর প্রথম প্রধান আন্তর্জাতিক ট্রফির খরা কাটে। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা জয়, এবং কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে ৩৬ বছরের খরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনাকে তৃতীয় বিশ্বকাপ উপহার দেন লিওনেল মেসি। সেই সাথে ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের সেরা বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন ফুটবলের অবিসংবাদিত ‘গড অফ ফুটবল’ (GOAT)।

৪. শেষ বিদায়: একটি যুগের অবসান

দীর্ঘ ২১ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের পর অবশেষে বুয়েনস আইরেসের এস্তাদিও মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিরুদ্ধে প্রীতি ম্যাচের মধ্য দিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে নিজের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেলেন মেসি।

  • এই বিদায়ী ম্যাচেও দেশের জার্সিতে গোল করে ও সতীর্থকে দিয়ে গোল করিয়ে নিজের শেষ মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখেন তিনি।
  • ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় তাঁর ১০ নম্বর জার্সির সম্মানে খেলা থামিয়ে পুরো স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানায়।
  • ৮৫ হাজার দর্শকের করতালি, আকাশছোঁয়া আতশবাজি আর তিন সন্তানকে পাশে নিয়ে যখন তিনি জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখলেন, তখন গোটা বিশ্ব তথা কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ ছিল অশ্রুসিক্ত।

অল্প বয়সে রোগকে জয় করে মাঠে নামা এক রোগাপাতলা ছেলে থেকে শুরু করে বিশ্বের কোটি মানুষের হৃদয় জয় করা ফুটবল সম্রাট—লিওনেল মেসির এই গল্প কেবল একটি খেলাধুলার ইতিহাস নয়, এটি বিশ্বাস, অধ্যাবসায় এবং রূপকথারও উর্দ্ধে এক জাদুকরী বাস্তবতার নাম।

Join Telegram

Join Now