শমীকের নেতৃত্বে আস্থা নেই, নিজেই সভাপতি হতে চান বিশ্বনাথ! দাবি জানিয়ে বিজেপি দফতর থেকে রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত চিঠি

গত কয়েক বছর ধরেই তাঁর বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সংগঠনকে শক্তিশালী করতে তাঁর ভূমিকা অপরিহার্য। সেই ভাবনা থেকেই রাজ্য নেতৃত্বের দায়িত্ব নিজের হাতে নিতে বারবার উদ্যোগী হয়েছেন তিনি। নানা স্তরে যোগাযোগ, আবেদন ও তদ্বির চালিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত রাজ্য বিজেপির সভাপতি পদে বসার সুযোগ পাননি বিশ্বনাথ দাস।

আগের রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের সময়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল এই দাবিদারের। তবে বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে এখনও সেই সুযোগ হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই লিখিতভাবে নিজের দাবি জমা দিয়েছেন তিনি রাজ্য দফতরে। শুধু সেখানেই থেমে থাকেননি, একই দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতি ভবনেও চিঠি পাঠিয়েছেন।
নদিয়ার হরিণঘাটা থানার চণ্ডীরামপুর তাঁর স্থায়ী ঠিকানা হলেও শৈশব কেটেছে কলকাতায়। তাঁর বাবার ওয়াটগঞ্জ এলাকায় গয়নার ব্যবসা ছিল বলেই জানান বিশ্বনাথ। তাঁর কথায়, ‘‘সে দোকান বাবার মৃত্যুর পরে বেহাত হয়ে যায়। মামলা করে আমি জিতেছি। কিন্তু দোকানের দখল এখনও পাইনি। আমার কোনও আয় নেই।’’ পারিবারিক ব্যবসার দখল ফিরে না পেলেও রাজনৈতিকভাবে রাজ্য বিজেপির নেতৃত্বের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য তাঁর চেষ্টা অব্যাহত। প্রায় দুই বছর ধরেই এই প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি আবারও বিধাননগরে রাজ্য বিজেপির দফতরে গিয়ে লিখিতভাবে সভাপতি হওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
গত সপ্তাহে একটি প্লাস্টিক ফোল্ডার হাতে নিয়ে দফতরে পৌঁছন বিশ্বনাথ। সেখানে উপস্থিত এক পদাধিকারী তাঁকে সহ-সভাপতি প্রবাল রাহার কক্ষে নিয়ে যান। তাঁর বক্তব্য ও দাবির গুরুত্ব বুঝেই তাঁকে পর্যায়ক্রমে আরও এক সহ-সভাপতি অমিতাভ রায়ের কাছে পাঠানো হয়। কিছুক্ষণ কথা বলার পর অমিতাভ বিষয়টি অনুধাবন করে তাঁকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক শশী অগ্নিহোত্রীর কাছে নিয়ে যান। বিশ্বনাথও মনে করেন, তাঁর সমস্যার সমাধান শশীর পক্ষেই সম্ভব। তাই তিনি নিজের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার বিবরণ তুলে ধরতে শুরু করেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, প্রথমে মনোযোগ দিয়ে তাঁর কথা শুনছিলেন শশী। কিন্তু দীর্ঘ আলোচনার পর তিনি বিশ্বনাথকে সংক্ষেপে মূল বক্তব্য জানাতে বলেন। তখন বিশ্বনাথ স্পষ্টভাবে জানান, শমীক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে রাজ্যে বিজেপির উন্নতি সম্ভব নয় বলে তাঁর ধারণা। তাই শমীককে সরিয়ে দিয়ে নিজেকে সভাপতি করার দাবি জানান তিনি এবং দলকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
এই কথা শুনে শশী প্রথমে বিস্মিত হয়ে পড়েন এবং বিষয়টি নিশ্চিত হতে পুনরায় প্রশ্ন করেন। বিশ্বনাথ একই বক্তব্য পুনরায় জানান। কিছুক্ষণ থেমে গিয়ে শশী পরিস্থিতি সামাল দেন এবং আলোচনায় ফেরেন। তিনি বিশ্বনাথের লিখিত আবেদন গ্রহণ করেন এবং আশ্বাস দেন যে বিষয়টি শমীক ভট্টাচার্যের সঙ্গে আলোচনা করবেন। বলেন, ‘‘ঠিক আছে, চিঠিটা আমার কাছে রইল। আমি একবার শমীকদার সঙ্গে আলোচনা করি। তিনি যদি সরে যেতে রাজি হন, তা হলে আপনি চলে আসবেন।’’
তবে এখনও পর্যন্ত বর্তমান সভাপতির সঙ্গে দেখা করতে না পেরে কিছুটা অস্বস্তিতেই রয়েছেন বিশ্বনাথ। সামনে নির্বাচন, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এই পরিস্থিতিতে দ্রুত দায়িত্ব না পেলে দলের উন্নয়ন কীভাবে সম্ভব হবে, তা নিয়েই চিন্তিত তিনি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে সুকান্ত মজুমদারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তাঁর। তাঁর কথায়, ‘‘সুকান্তবাবু আমাকে বলেছিলেন, এখন তো সভাপতি হওয়ার সুযোগ নেই। সুযোগ হলে আপনাকে জানাব। তার পরে আমি দিল্লি চলে গিয়েছিলাম। চিঠি লিখেই নিয়ে গিয়েছিলাম। রাষ্ট্রপতি ভবনে সে চিঠি জমাও করি। কিন্তু ডাক এল না। দিল্লিতে থাকতে থাকতে শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন ১৮ থেকে নেমে ১২ হয়ে গিয়েছে। তাই ফিরে এলাম। এখন আমি দায়িত্ব না-নিলে আর হবে না।’’
বর্তমানে পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন বিশ্বনাথ। বাড়িতে রয়েছেন তাঁর মা, ভাই, ভ্রাতৃবধূ এবং দুই ভাইপো। ভাই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। নিজের প্রয়োজন মেটাতে মায়ের গয়না বন্ধক রেখে দিল্লিতে গিয়ে এক বছর নিরাপত্তারক্ষীর কাজও করেছেন তিনি। তবে তাঁর মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অবস্থান সুরক্ষিত নয় বুঝেই তিনি ফিরে এসেছেন।
এখন তিনি অপেক্ষা করছেন দলের তরফে সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার জন্য। তাঁর বিশ্বাস, সেই দায়িত্ব পেলে বর্তমান আর্থিক অনিশ্চয়তাও কেটে যাবে এ কথাও তিনি তাঁর চিঠিতে উল্লেখ করেছেন।








