‘ভোটের খেলায় সাপ-লুডো!’ প্রকল্পে সিঁড়ি, বিজেপি নেতায় সাপ—নতুন কৌশলে তৃণমূল

সরকারি পরিষেবা সরাসরি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ‘দুয়ারে সরকার’ কর্মসূচি চালিয়ে আসছে নবান্ন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সহজে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

এবার সেই অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরও সংগঠিতভাবে প্রচারে নামছে তৃণমূল। লক্ষ্য একটাই,রাজ্যের প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া সরকারি প্রকল্পের বার্তা এবং তার সঙ্গে দলীয় অবস্থানকে আরও মজবুত করা।
শুধু প্রচারেই সীমাবদ্ধ থাকছে না এই পরিকল্পনা, বরং আসন্ন বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ এবং ঐতিহ্যকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ দুয়ারসজ্জার উপকরণও পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে শাসকদল। এতে যেমন বাঙালিয়ানা রয়েছে, তেমনই হালকা ধর্মীয় আবহের ছোঁয়াও রাখা হয়েছে, যাতে বৃহত্তর ভোটারগোষ্ঠীর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়।
জানা যায়, তৃণমূল পাড়ায় পাড়ায় সাপ-লুডোর বোর্ড বিলি করতে চলেছে। এই বোর্ডটি শুধু একটি খেলা নয়, বরং একটি রাজনৈতিক বার্তা বহনকারী মাধ্যম হিসেবে তৈরি করা হয়েছে। বোর্ডে উপরে ওঠার ‘সিঁড়ি’ হিসেবে দেখানো হয়েছে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পকে, অর্থাৎ উন্নয়নই সাফল্যের পথ এই বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
অন্যদিকে ‘সাপের মুখ’-এর জায়গায় বসানো হয়েছে কেন্দ্রীয় ও রাজ্যের বিজেপি নেতাদের মুখাবয়ব, যা প্রতীকীভাবে বোঝাতে চাওয়া হয়েছে বাধা বা প্রতিবন্ধকতাকে। শুধু লুডো বোর্ড নয়, এর সঙ্গে আরও দুটি প্রচার সামগ্রী যুক্ত করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে খবর। মঙ্গলবার থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় এই সামগ্রী পৌঁছাতে শুরু করেছে এবং বুধবার থেকে তা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হবে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রাজ্যের প্রতিটি বুথ স্তরে এই তিন ধরনের ‘উপহার’ পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
এই প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল ২০২৬ সালের একটি ভাঁজ করা পকেট ক্যালেন্ডার। ক্যালেন্ডারটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে প্রতিটি ভাঁজে রাজ্য সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের সংক্ষিপ্ত বিবরণ থাকে,যেমন ‘যুবসাথী’, বাড়ি বাড়ি পরিশ্রুত পানীয় জল পৌঁছে দেওয়া, আবাস যোজনার সুবিধা ইত্যাদি। পাশাপাশি তৃণমূলের নির্বাচনী ইস্তাহারে ঘোষিত নতুন সাতটি জেলা এবং কয়েকটি পুরসভা গঠনের পরিকল্পনাও সেখানে গ্রাফিক্সের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো প্রকল্পের সামাজিক প্রভাব—বিশেষ করে মহিলাদের আর্থিকভাবে স্বনির্ভর করে তোলার দিকটি সংক্ষেপে বোঝানো হয়েছে, যাতে সাধারণ ভোটার সহজে বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারেন। ক্যালেন্ডারের সামনের অংশে মমতার ছবি দিয়ে লেখা থাকছে, ‘আবার জিতবে বাংলা’, এবং তার নীচে, ‘যে লড়ছে সবার ডাকে, সেই জেতাবে বাংলা মাকে’। এখানে স্পষ্টভাবে বাংলাকে ‘মা’ রূপে উপস্থাপন করে আবেগঘন বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, যা বিজেপির ‘ভারতমাতা’ কেন্দ্রিক প্রচারের একটি পাল্টা কৌশল হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে যে দুয়ারসজ্জার উপকরণ তৈরি করা হয়েছে, সেটিও অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে সাজানো। চাঁদমালার আদলে তৈরি এই সজ্জায় ছ’টি ভাগে ছ’টি প্রকল্পকে ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার, স্বাস্থ্যসাথী, কৃষকবন্ধুর মতো জনপ্রিয় প্রকল্পগুলি সেখানে জায়গা পেয়েছে। উপরে বাঁ দিকে লেখা রয়েছে ‘শুভ নববর্ষ’, আর তার দু’পাশে গাঁদাফুল ও আম্রপল্লবের নকশা ব্যবহার করে উৎসবের আবহ তৈরি করা হয়েছে। ডান দিকে মমতার ছবি এবং তৃণমূলের জোড়াফুল প্রতীকের মাঝে ‘আবার জিতবে বাংলা’ স্লোগানটি রাখা হয়েছে, যা রাজনৈতিক বার্তাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং ব্যতিক্রমী অংশ হল সাপ-লুডোর বোর্ডটি। এখানে পুরো বোর্ড জুড়ে রাজ্য সরকারের প্রকল্পগুলির খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে। সিঁড়ির নীচে রয়েছে প্রকল্পগুলির নাম বা বাস্তব ছবি, আর সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলে দেখা যাচ্ছে উপভোক্তাদের সুবিধা পাওয়ার চিত্র।
উদাহরণ হিসেবে, ৯ নম্বর ঘরে ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্প রয়েছে, যেখান থেকে সিঁড়ি বেয়ে সরাসরি ৩০ নম্বর ঘরে পৌঁছানো যায়, সেখানে দেখানো হয়েছে প্রকল্পের মাধ্যমে প্রাপ্ত সুবিধা। আবার ১২ নম্বর ঘরে থাকা ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ থেকে সোজা ৯৬ নম্বর ঘরে পৌঁছানো যায়—যা বোর্ডের দীর্ঘতম সিঁড়ি এবং দ্রুত জয়ের প্রতীক। তবে ১০০ বা ‘জয় বাংলা’ ঘরে পৌঁছাতে গেলে খেলোয়াড়দের পার হতে হবে ‘দু’মুখো সাপ’, যার এক দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অন্য দিকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মুখাবয়ব রয়েছে।
এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পৌঁছালে পিছিয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বোর্ডের অন্যান্য সাপের মুখেও বিভিন্ন বিজেপি নেতার ছবি—যেমন শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, দিলীপ ঘোষ ও শমীক ভট্টাচার্য,ব্যবহার করা হয়েছে, এবং পাশে ‘কেন্দ্রীয় বঞ্চনা’র অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছে।
এই পুরো প্রচার পরিকল্পনার পিছনে যে রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক কাজ করছে, তা স্পষ্ট বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক মহলের একাংশ। জনসংখ্যার বিন্যাস, ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এবং স্থানীয় ইস্যু বিচার করে এই সামগ্রী তৈরি ও বিতরণ করা হচ্ছে। প্রথম দফার ভোট যেসব কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে, সেখানে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত মূলত স্থানীয় স্তরের প্রচারেই জোর দেওয়া হবে। প্রার্থীদের সফরের পাশাপাশি স্থানীয় সংগঠকদের একাধিকবার বাড়ি বাড়ি যাওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যক্তিগত স্তরে যোগাযোগ গড়ে তোলা যায়। সেই সময়েই এই প্রচারসামগ্রী সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে, প্রচারের এই নতুন কৌশল কতটা কার্যকর হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে। এখন দেখার, এই ‘প্রচারের সিঁড়ি’ বেয়ে তৃণমূল আবার নবান্নের ১৪ তলায় ফিরতে পারে কি না। সেই উত্তর মিলবে মঙ্গলবার থেকে ৩৪ দিন পর, ভোটের ফলাফল প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই।











